English

ইয়াবা ডন কার্লোসের অপকর্মের ফিরিস্তি দেখে বিস্মিত খোদ তদন্তকারীরা

১২ জুলাই ২০১৭, ১৫:৩২

ডেক্স রিপোর্ট , জনসংবাদঃ আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ ওরফে সালেহ আহমেদ ওরফে কার্লোস সালেহ। বাংলা চলচ্চিত্রের একজন প্রযোজক। রাজধানী ঢাকার অঘোষিত ইয়াবা ডনও বলা হয় তাকে। নারী গৃহকর্মীর সঙ্গে যৌনাচার করতে গিয়ে বাধা পেয়ে সাততলা থেকে তাকে ছুড়ে ফেলে হত্যা করতে চেয়েছিল কার্লোস। এ ঘটনায় তিনি এখন কারাগারে। এদিকে তিনি যখন বন্দি, তখন তার সম্পর্কে বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তার অপরাধের ফিরিস্তি দেখে বিস্মিত খোদ তদন্তকারী কর্মকর্তারা।

নামী-দামী মডেল, অভিনেতা-অভিনেত্রী-খেলোয়াড় থেকে শুরু করে শিল্পপতি, প্রশাসনিক ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছিলো তার নিয়মিত ওঠা-বসা। সাংসদ না হয়েও ‘সংসদ সদস্য’ মনোগ্রাম সংবলিত স্টিকার লাগানো মার্সিডিজ বেঞ্জ, ল্যান্ড ক্রজার ও নিশান পাজেরো জিপ গাড়ি হাকিয়ে চলতেন প্রকাশ্যেই। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রাসায়নিক দ্রব্য গ্রহণের পর বিকৃত যৌনাচার ছিলো তার শখ। রাজধানীর পরীবাগের নিজ এ্যাপার্টমেন্টে বসে এটিএম বুথ সদৃশ মেশিন বসিয়ে সেই যন্ত্র থেকে টাকা তুলতেন বলে ভুক্তভোগী গৃহকর্মীর বরাতে জানিয়েছেন তার ভাই শুক্কুর আলী।

নামে-বেনামে দেশে ও দেশের বাইরে এই কার্লোসের রয়েছে বিভিন্ন ব্যবসা। এসব প্রতিষ্ঠানের আড়ালে দিব্বি চালিয়ে যেতেন মাদক ও হুণ্ডির ব্যবসা। এই মাদক ও হুণ্ডির ব্যবসাই কার্লোসের অবৈধ অর্থের সবচেয়ে বড় যোগানদাতা। এই কালো টাকাই তিনি বিনিয়োগ করেন চলচ্চিত্রে। ২০১৫-১৬ সালে কার্লোসের ড্রিম বক্স প্রোডাকশন হাউস থেকে মুক্তি পায় ‘অস্তিত্ব’ সিনেমাটি। তবে চলচ্চিত্রের আড়ালে তিনি উঠতি মডেল ও নায়িকাদের নিয়ে প্রমোদ ভ্রমণে যেতেন বিদেশে। ফিরতেন একাই। মানব পাচার, স্বর্ণ চোরাচালানসহ নানা অপকর্মেরও হোতা ছিলেন এই কার্লোস। সার্বক্ষণিক সাংসদপুত্র বন্ধুর সেল্টারে থাকায় এতদিন এই দুধর্ষ কার্লোসের টিকিটিও ছুঁতে পারেনি কেউ।

অবশেষে গত ৩০ জুন দিনগত রাতে যৌনাচারে ব্যর্থ হয়ে পরীবাগের নিজ এ্যাপার্টমেন্টের সাততলা থেকে নারী গৃহকর্মীকে ছুড়ে ফেলে বিপাকে পড়েন কার্লোস। ঘটনার পরদিন রাজধানীর মিরপুর থেকে গ্রেপ্তার হন তিনি। একদিনের রিমান্ড শেষে বর্তমানে কারাগারে কার্লোস। সবিস্তারে ধর্ষণকাণ্ডের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আদালতে। যদিও এটাই তার প্রথম কারাবাস নয়। নানা অপকর্মের দায়ে এর আগেও তাকে দেশে এবং দেশের বাইরের কারাগারের বাসিন্দা হতে হয়েছে।

এদিকে পরীবাগের দিগন্ত টাওয়ার থেকে ওই ঘটনার পরদিন পুলিশ ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে কার্লোসের বাবা আবুল হোসেনকেও। তিনি ‘মুক্তিযোদ্ধা দল’র কেন্দ্রীয় নেতা। আদালতের মাধ্যমে জামিন পেয়ে বর্তমানে তিনি মুক্ত। গৃহকর্মীকে নির্যাতনের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা থাকার কথা অস্বীকার করলেও পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, কার্লোসের এই অধঃপতনের জন্য অনেকটাই দায়ী তিনি।

এদিকে ভবন থেকে গৃহকর্মীকে ফেলে হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্তে নেমে কার্লোসের অপরাধ সাম্রাজ্যের ফিরিস্থি দেখে বিস্মিত তদন্তকারীরা। তার এসব অপকর্মে যুক্ত রথি-মহারথিদের নাম দেখে হতবাক তারা। কার্লোসের গোপন ইয়াবা তৈরির কারখানার সন্ধানে এখন আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হত্যাচেষ্টা অভিযোগের দায় স্বীকার করলেও তদন্তে কার্লোসের অন্য অপরাধনামাও প্রাধান্য পাবে।

এদিকে ৭ তলা থেকে পড়েও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কার্লোসের ওই গৃহকর্মী এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছেন। গতকাল সোমবারও তার শরীরে অস্ত্রপচার করেছেন চিকিৎসকরা। মায়ের এমন করুণ পরিণতি ছোট মেয়েকে এখনও জানায়নি গৃহকর্মীর স্বজনরা। হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর আনুসাঙ্গিক ওষুধ কিনতে কিনতে টাকার চিন্তায় চোখে অন্ধকার দেখছেন গৃহকর্মীর স্বজনরা। বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছেন তার বাবা। রিকশা চালিয়ে মেয়ের চিকিৎসা আর তাকে দেখভালের দায়িত্বে থাকা মা-ভাইয়ের খাবার যোগাচ্ছেন তিনি।

গৃহকর্মীর স্বজনদের অভিযোগ, মানবতার বড় বড় বুলি আউরানো মানবাধিকার সংঘটনের কর্মীরা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা দূরে থাক দেখতেও আসেনি। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেননি বিত্তবানরাও। ফলে চরম অর্থকষ্টে এখন মানবেতর দিন কাটছে তাদের। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন গৃহকর্মীর অসহায় পরিবার।

কাজে যোগদানের পরপরই ভুক্তভোগী গৃহকর্মীর কাছ থেকে কার্লোস যে মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়েছিলো সোমবার সেটি আহত গৃহকর্মীর মা মাসুমা বেগম ও ভাই শুক্কুর আলীর কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। মাসুমা বেগম জানিয়েছেন, মাত্র ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে তার মেয়েকে কার্লোসের হাতে তুলে দেয় গৃহকর্মীরুপী দালাল নাজমা।

জানা গেছে, অস্ট্রেলিয়ায় পড়ালেখা করতে গিয়ে কার্লোস জড়িয়ে পড়েন মাদক ব্যবসার আন্তর্জাতিক র‌্যাকেটে। অস্ট্রেলিয়া থেকে কানাডা, সিঙ্গাপুর এবং থাইল্যান্ডে গড়ে তোলেন মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক। ব্যবসায়িক পার্টনার মাদক মাফিয়ারাই তার নাম দেয় কার্লোস। অস্ট্রেলিয়ায় তার এক সন্তান ও স্ত্রী রয়েছে। ২০১৪ সালে নারী নির্যাতন ও মাদক ব্যবসার অভিযোগে অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুর সরকার একবার তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে। এরপর থেকে ওই দুটি দেশ আর মারাননি কার্লোস।

বিদেশের মাটিতে সুবিধা করতে না পেরে দেশে ফিরে মাদকের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন তিনি। আরও জানা গেছে, ২০১৪ সালে একবার রাজধানীর শাহবাগে ৩ হাজার ইউরো, ৭ হাজার ৮৭৬ ইউএস ডলার, ৭ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল, ৮ লাখ টাকা, ২৩ পিস ইয়াবা এবং জাতীয় সংসদের মনোগ্রাম খচিত নম্বর প্লেটহীন একটি নতুন মার্সিডিজ বেঞ্জ জিপসহ কার্লোসকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। জামিনে ছাড়া পেয়ে নিজের ক্লিন ইমেজ গড়তে বেছে নেন চলচ্চিত্রের পথ। অর্থলগ্নি করেন অনন্য মামুনের ‘অস্তিত্ব’ ছবিতে। গৃহকর্মীকে পিটিয়ে ৭ তলা থেকে ফেলে দেয়ার রাতেই কার্লোসের পরীবাগের বাসা থেকে ফের জাতীয় সংসদের মনোগ্রাম খচিত একটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করে র‌্যাব।

টাকার বিনিময়ে নবাগত ও উঠতি মডেলদের নিয়ে উচ্চমানের নেশা গ্রহণের পর বিশেষ সময় কাটানো ছিলো কার্লোসের রুটিন ওয়ার্ক। যৌনসঙ্গমে অক্ষম থাকায় তিনি এই নেশা জাতীয় জিনিস গ্রহণ করতেন। পরীবাগের বাসাতেও সপ্তাহে ২ দিন বসাতেন জলসা। এমনকি সুন্দরী মডেলদের দিয়ে রমরমা অবৈধ ব্যবসার তথ্যও মিলেছে তদন্তে। এসব নায়িকাদের মধ্যে সর্বশেষ একজনের সঙ্গে তার লিভটুগেদার চলছিলো পরীবাগের ফ্লাটে। ঘটনার রাতে তাকেও পিটিয়ে আহত করেন কার্লোস। কার্লোসের অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে বাংলাদেশের একজন তারকা ক্রিকেটারের নামও উঠে এসেছে তদন্তে। কার্লোসের সঙ্গে সেই ক্রিকেটারের অস্ট্রেলিয়ার একটি গোপন স্থানে বৈঠক করার ছবিও উদ্ধার করেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

আরও জানা গেছে, কার্লোস শুধু ইয়াবা ডনই নয়, স্বর্ণ চোরাচালানের গডফাদারও। বাংলাদেশের বড় বড় স্বর্ণ চোরাচালান মামলায় যে কজন বাংলাদেশি গডফাদারের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে কার্লোসও রয়েছেন। ২০১৩ সালের ২৪ জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশ বিমানের বিজি ৭০২ ফাইটে ১২৪ কেজি স্বর্ণের চালান উদ্ধারের ঘটনায় করা বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ডিবি পুলিশের এক সহকারী কমিশনার ১৮ জনকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করেন। এতে বিমানের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী, এক বিদেশি নাগরিক ও কয়েকজন ব্যবসায়ীকে অভিযুক্ত করা হয়। ওই ব্যবসায়ীদের মধ্যেও সালেহ আহম্মেদ খান (এজেডএম সালেহ আহম্মেদ (৩৫) ওরফে কার্লোস) রয়েছে। স্বর্ণগুলো তাদের (ব্যবসায়ী) জন্যই আনা হয়েছিল বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়। আদালতের নির্দেশে মামলাটি বর্তমানে পুনঃতদন্তাধীন রয়েছে।

গৃহকর্মীকে ফেলে দেয়ার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাফর আলী বিশ্বাস বলেন, যে অপরাধে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে সালেহ আহমেদ ওরফে কার্লোস তার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে এই মামলার বাইরেও বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। হত্যাচেষ্টা অভিযোগের দায় স্বীকার করলেও কার্লোসের অন্য অপরাধনামা।

সর্বাধিক ক্লিক