ঢাকাThursday , 10 July 2025
  1. অন্যান্য
  2. অর্থনীতি
  3. আইন বিচার
  4. আন্তর্জাতিক
  5. ক্যাম্পাস
  6. খেলাধুলা
  7. গণমাধ্যম
  8. জনপ্রিয় সংবাদ
  9. জাতীয়
  10. বিনোদন
  11. রাজধানী
  12. রাজনীতি
  13. সারাদেশ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

খাল নদী দখল বার্ষিক বন্যা কবলিত নোয়াখালী

admin
July 10, 2025 2:43 pm
Link Copied!

*নোয়াখালী জেলার বার্ষিক বন্যা: নদী-খাল ভরাট, অবৈধ দখল এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার নির্মম*

নোয়াখালী, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি উপকূলীয় জেলা, যার অবস্থান অনেকটা নিচু হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু বিগত এক দশক ধরে নোয়াখালীতে বন্যা ও জলাবদ্ধতার প্রকোপ যে হারে বেড়েছে, তাতে প্রকৃতির চেয়ে মানবসৃষ্ট বিপর্যয় বেশি দায়ী। পরিকল্পনাহীন নগরায়ন, নদী-খাল দখল, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব, প্রশাসনের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব—সব মিলিয়ে আজ নোয়াখালীবাসী প্রতিবছর বন্যায় ভাসছে।

*নদী-খাল ভরাট: নোয়াখালীর হৃদয়ে বিষাক্ত ছুরি*
নোয়াখালী জেলায় এক সময় শত শত খাল, ছড়া, নদী, বিল ও খোয়াট ছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে খাল খনন প্রকল্পের মাধ্যমে পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সুসংহত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে গত এক যুগে যেভাবে খাল-নদী দখল করে বাড়ি-ঘর, দোকানপাট, রাস্তা ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি সুপরিকল্পিত দুর্নীতির ফসল।

স্থানীয় জনগণের অভিযোগ, এসব দখলের পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, ভূমি অফিসের অসৎ কর্মচারী ও কিছু প্রশাসনিক কর্মকর্তা। খাল ভরাট করে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে, প্লট কাটা হয়েছে, এমনকি নামজারি করেও দেয়া হয়েছে—যা সম্পূর্ণ অবৈধ হলেও প্রশাসনের নীরব সম্মতি পাচ্ছে।

*প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংস: পরিবেশ ও কৃষির উপর প্রভাব*
নোয়াখালীর হাজার হাজার কৃষক পানি সেচের জন্য খাল ও পুকুরের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু খাল ভরাট ও নালার ধ্বংসের ফলে জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, সেচের পানি পাচ্ছে না কৃষকরা, ধানের ফলন কমে গেছে। এছাড়াও, খাল ও পুকুর ছিল মাছ চাষের প্রধান উৎস, যেখান থেকেও অর্থনৈতিক সুবিধা পেত সাধারণ মানুষ।

কিন্তু এখন, খাল ভরাটের ফলে পুকুর শুকিয়ে যাচ্ছে, মাছ চাষ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, প্রাকৃতিক মাছের উৎস কমে গেছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, জলাশয় ধ্বংসের এই প্রবণতা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও ত্বরান্বিত করছে।

*প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও দুর্নীতি:*
স্থানীয় মানুষ, সাংবাদিক ও সামাজিক সংগঠন বারবার লিখিতভাবে প্রশাসনকে অবহিত করলেও কার্যত কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা দখলকারীদের কাছ থেকে মাসোহারা নিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছেন।

২০২3 সালের বন্যা পরবর্তী সময়ে অনেক এলাকায় খালের পানিতে নালা বন্ধ হয়ে থাকলেও মেরামতের কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং উল্টোভাবে, অনেক জায়গায় সরকারি খাল ও জমি দখলের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছত্রছায়া লক্ষ্য করা গেছে।

*শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন প্রকল্প: এখন ইতিহাস মাত্র*
নোয়াখালী জেলায় প্রতি বছর বন্যা একটি নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। এই বন্যার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় নদী-খাল ভরাট, অবৈধ দখল এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা। এই প্রতিবেদনটি নোয়াখালীর বন্যা পরিস্থিতি, এর কারণ এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবে।

নদী-খাল ভরাট ও অবৈধ দখল

নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন এলাকায় নদী, খাল, বিল এবং জলাশয়গুলো অবৈধভাবে ভরাট করে বসতি, দোকানপাট এবং রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। এই অবৈধ দখলের ফলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে, যা বন্যার প্রধান কারণ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং দখলদার চক্র প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহায়তায় এই অবৈধ দখল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তারা মাসোহারা দিয়ে প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে যাচ্ছে, ফলে বছরের পর বছর এই অবস্থা চলমান রয়েছে।

প্রশাসনিক ব্যর্থতা
বিগত বছরগুলিতে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বন্যা পরবর্তী সময়ে কিছু ত্রাণ কার্যক্রম চালানো হলেও, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি।

স্থানীয় জনগণের অভিযোগ, প্রশাসনের উদাসীনতা এবং দুর্নীতির কারণে বন্যা পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা দখলদারদের সঙ্গে মিলে খাল ও নদী ভরাটের অনুমতি দিচ্ছেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।

বন্যার প্রভাব
৭০-৮০’র দশকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সারা দেশে খাল খননের একটি ব্যাপক প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। নোয়াখালীও এর আওতাভুক্ত ছিল। তখন এই জেলায় পানি প্রবাহ, সেচ ও বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই খালগুলো দখল করে ফেলেছে। প্রশাসনের প্রশ্রয়ে দখলদাররা খাল ভরাট করে সেখানে বসতি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে।

*২০২4 সালের বন্যা পরিস্থিতি: নোয়াখালীর অন্ধকার ভবিষ্যৎ*
চলতি বছর বর্ষার শুরুতেই নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায় জলাবদ্ধতা শুরু হয়েছে। বেগমগঞ্জ, সেনবাগ, সোনাইমুড়ী, চাটখিল, কবিরহাট, সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জসহ প্রায় প্রতিটি এলাকায় পানিতে ডুবে গেছে রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি। শত শত মানুষ ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। পানি নেমে না যাওয়ায় শুরু হয়েছে পানিবাহিত রোগ, শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত।

*বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছে বন্যার সাথে সাথে*
প্রতি বছর দেখা যায়, বন্যার সাথে সাথেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যায়। নোয়াখালীতে গ্যাস, চাউল, পেঁয়াজ, ডাল, এমনকি কাফনের কাপড় পর্যন্ত গত বছর দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয়েছে। অথচ এই অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কোনও অভিযান চলেনি। বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছে।
*জনগণের আহ্বান ও দাবিসমূহ:*
১. অবিলম্বে খাল ও জলাধার দখলমুক্ত করতে হবে
২. শহীদ জিয়াউর রহমানের খাল খনন প্রকল্প পুনরায় চালু করতে হবে
প্রতি বছর বন্যার ফলে নোয়াখালী জেলার হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বন্যার পানি বসতবাড়ি, ফসলের মাঠ এবং রাস্তাঘাট ডুবে যায়, ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে, এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়।

বন্যার কারণে খাদ্য সংকট দেখা দেয়, এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। স্থানীয় বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না, ফলে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ে।
সমাধানের উপায়:
নোয়াখালী জেলার বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:

1. *অবৈধ দখল উচ্ছেদ:* নদী, খাল, বিল এবং জলাশয় থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ পুনরুদ্ধার করতে হবে।

2. *খাল পুনঃখনন:* বিগত দিনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন প্রকল্পের মতো নতুন খাল খনন প্রকল্প গ্রহণ করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।

3. *প্রশাসনিক দুর্নীতি রোধ:* প্রশাসনের মধ্যে থাকা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

4. *জনসচেতনতা বৃদ্ধি:* স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করে অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

5. *দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ:* বন্যা সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

: নোয়াখালী জেলার বারবার বন্যা পরিস্থিতি একটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। অবৈধ দখল, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং উদাসীনতার কারণে এই দুর্যোগ দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, যাতে নোয়াখালীর মানুষ বন্যার কবল থেকে মুক্তি পায় এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।
৩. দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করে বিচার করতে হবে
৪. জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং টিম গঠন করতে হবে
৫. স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে ‘খাল রক্ষা কমিটি’ গঠন
৬. নতুন জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকল্প হাতে নিতে হবে
৭. বন্যাকবলিতদের জন্য জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে
নোয়াখালীতে প্রতিবছরের বন্যা এখন আর শুধুই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি এখন একটি ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার পরিণতি। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শুধু মুখস্থ প্রশাসনিক বিবৃতি নয়—চাই বাস্তব পদক্ষেপ। খাল রক্ষা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, এবং জনসম্পৃক্ত পরিকল্পনার মাধ্যমেই এই সমস্যা সমাধান সম্ভব।
নাহলে আগামী দিনে নোয়াখালীর প্রতিটি বর্ষা মরসুম মানেই হবে—আরও ভয়াবহ দুর্ভোগ, ভাঙা স্বপ্ন আর পানিতে ডুবে যাওয়া ভবিষ্যৎ।নোয়াখালী বন্যা কবলিত