জাতীয় সংসদে সম্প্রতি পাস হওয়া ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল ২০২৬ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সংশোধিত এই আইনে ই-সিগারেট, ভ্যাপ এবং নিকোটিন পাউচসহ উদীয়মান তামাকজাত পণ্যের নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত ধারা বাতিল করা হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে এসব পণ্য কার্যত নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাজারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে করে দেশের তরুণ প্রজন্ম বিশেষ ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং তামাক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অগ্রগতি ব্যাহত হতে পারে।
আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ই-সিগারেট বৈধ করার এই পদক্ষেপ দেশের সর্বোচ্চ আদালতের পূর্ববর্তী নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আপিল বিভাগ ২০১৬ সালের এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে দেশে তামাকের ব্যবহার যৌক্তিক সময়ের মধ্যে কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই ‘নীতিগত পশ্চাদপসরণ’ হিসেবে দেখছেন।
তামাক নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতির বিপরীতমুখী পদক্ষেপ
২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের সময় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নকে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওই উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা পায়। তবে বর্তমান সংশোধনী সেই অগ্রগতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
রাজস্ব বনাম জনস্বাস্থ্য—বিতর্ক তুঙ্গে
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংসদে বলা হয়েছে, রাজস্ব আয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই ই-সিগারেট সংক্রান্ত বিধান শিথিল করা হয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই যুক্তিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন।
তাদের মতে, বাংলাদেশে তামাকজনিত ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধির যুক্তিতে জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলা দীর্ঘমেয়াদে ‘রোগের অর্থনীতি’ তৈরি করবে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: কঠোর অবস্থানে বিশ্ব
আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, বিশ্বব্যাপী ই-সিগারেটের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের ১৩২টি দেশ কোনো না কোনোভাবে ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করেছে, যার মধ্যে ৪৬টি দেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বিধিনিষেধ শিথিল করার সিদ্ধান্তকে অনেকেই বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীত হিসেবে দেখছেন।
মাদক ব্যবহারের নতুন মাধ্যম হিসেবে আশঙ্কা
আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ই-সিগারেট বা ভ্যাপের তরলে ‘এমডিএমবি’ নামক বিপজ্জনক মাদক মেশানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ নামে পরিচিত। এটি অপরাধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এসব পণ্য বাজারে ছেড়ে দিলে তা মাদক বিস্তারের নতুন পথ তৈরি করতে পারে, যা যুবসমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি।
নিকোটিন পাউচ উৎপাদন নিয়েও প্রশ্ন
এদিকে, একটি বহুজাতিক কোম্পানিকে দেশে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মাত্র ৬১ কোটি টাকার বিনিয়োগের বিপরীতে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেখানে নিকোটিন পাউচ নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে এ ধরনের উৎপাদনের অনুমোদন দেওয়াকে জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন অনেকে।
দ্রুত কার্যকর আইন প্রণয়নের দাবি
বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটসহ (বাটা) বিভিন্ন সংগঠন সম্মিলিতভাবে এক বিবৃতিতে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচসহ সকল ধরনের উদীয়মান তামাকজাত পণ্য দ্রুত নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে পূর্বের অঙ্গীকার বজায় রেখে দ্রুত কার্যকর আইন প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমোদন বাতিলের দাবিও জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট (বাটা), বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল এডভোকেটস (বিটিসিএ), বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি), বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল রিসার্চ নেটওয়ার্ক (বিটিসিআরএন), বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি, এইড সোস্যাইটি, আর্থ ফাউন্ডেশন, সেতু, লিডার্স ইন টোব্যাকো কন্ট্রোল এলামনাই এসোসিয়েশন, প্রত্যাশা মাদক বিরোধী সংগঠন, পাবলিক হেলথ ল’ইয়ার্স নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্য আন্দোলন, তামাক বিরোধী নারী জোট, ইউনাইটেড ফোরাম এগেইনস্ট টোব্যাকো, স্কুল অব লাইফ এবং ইয়ুথ ফর টোব্যাকো ফ্রি বাংলাদেশ।
সংশোধিত আইনের এই সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্য, তরুণ প্রজন্ম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের পক্ষ থেকে এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তে কোনো পুনর্বিবেচনা আসে কিনা এবং জনস্বার্থ রক্ষায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

