দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর খবর বাড়তে থাকায় জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতে সাধারণ জ্বর-ঠান্ডা ভেবে অবহেলা করা এবং সময়মতো টিকা না নেওয়াই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে প্রথম ৩-৪ দিন জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, কাশি এবং চোখ লাল হওয়া দেখা যায়। এ সময় রোগটি সাধারণ সর্দি-কাশি মনে হওয়ায় অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। তবে মুখের ভেতরে গালের পাশে ছোট সাদা দানার মতো দাগ—যাকে Koplik’s Spots বলা হয়—হাম শনাক্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত।
এরপর ১-২ দিনের মধ্যে শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দেয়, যা সাধারণত কান থেকে শুরু হয়ে মুখ ও শরীরের নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। র্যাশ পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ার সময় জ্বর অনেক বেড়ে যেতে পারে, যা কখনো কখনো ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছায়।
চিকিৎসকদের মতে, হাম সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে সেরে গেলেও কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে র্যাশ ওঠার পরও জ্বর না কমা বা আবার বেড়ে যাওয়া নিউমোনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। এছাড়া শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘুম, খিঁচুনি, চোখে অতিরিক্ত লালভাব, কান ব্যথা বা কান দিয়ে পানি পড়া এবং শিশুর পানি গ্রহণ কমে যাওয়া—এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, হাম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে আক্রান্ত শিশু সুস্থ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় অন্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে “ইমিউন অ্যামনেশিয়া” নামে পরিচিত।
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। সাধারণত ভিটামিন এ, জ্বর নিয়ন্ত্রণে প্যারাসিটামল এবং পর্যাপ্ত পানি ও বিশ্রামের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এমএমআর (MMR) টিকা গ্রহণ। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়, যা প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর।
টিকা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা—বিশেষ করে “টিকা দিলে অটিজম হয়”—সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এ সংক্রান্ত গবেষণা বহু আগেই ভুয়া প্রমাণিত হয়ে বাতিল হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, শিশুর টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে কি না তা যাচাই করা এবং কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। সচেতনতা বৃদ্ধি ও সময়মতো টিকা গ্রহণই পারে হামজনিত ঝুঁকি থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে।

