নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী পৌরসভাকে ঘিরে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সরগরম পরিবেশ বিরাজ করছে। দীর্ঘদিনের নানা সমস্যা, উন্নয়ন ঘাটতি, নাগরিক সেবার সীমাবদ্ধতা এবং সুশাসনের প্রশ্নে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পৌরবাসীর একটি বড় অংশ নতুন নেতৃত্বের সন্ধান করছে, যারা দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি আধুনিক, পরিকল্পিত এবং ইনসাফভিত্তিক পৌরসভা গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন। এমন প্রত্যাশার জায়গা থেকেই আলোচনায় উঠে এসেছে সৈয়দ রেজায়ে রাব্বি (মাহবুব) নামটি।
স্থানীয়দের মতে, সোনাইমুড়ী পৌরসভা দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকটে জর্জরিত। সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, জলাবদ্ধতা, ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা—এসব সমস্যা নাগরিক জীবনে ভোগান্তি বাড়িয়ে তুলেছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলীয় কোন্দল, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য এবং সুশাসনের অভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, পুরোনো ধারার বাইরে গিয়ে একজন পরিচ্ছন্ন, অভিজ্ঞ এবং জনমুখী নেতৃত্বই পারে এই পৌরসভাকে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে।
এই প্রেক্ষাপটে সৈয়দ রেজায়ে রাব্বি (মাহবুব) একজন সম্ভাবনাময় প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসছেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, তৃণমূল পর্যায়ের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে বলে মনে করছেন তার সমর্থকরা। তারা বলছেন, তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং একজন সংগঠক, যিনি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের পাশে থেকে কাজ করে আসছেন।
১৯৭২ সালের ১লা জানুয়ারি সোনাইমুড়ীর ভানুয়াই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ রেজায়ে রাব্বি (মাহবুব)। তার পিতা সৈয়দ আলমগীর ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সংগঠক, যা তার রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পারিবারিকভাবে রাজনৈতিক আদর্শে বেড়ে ওঠার ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তার মা সৈয়দা কহিনুর আক্তারও পরিবারে নৈতিক মূল্যবোধ ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তার পারিবারিক জীবনও সুশৃঙ্খল। তার স্ত্রী মোছা. সখিনা বেগম একজন শিক্ষিকা হিসেবে সমাজে সম্মানিত অবস্থানে রয়েছেন। তাদের দুই সন্তান রয়েছে, যারা শিক্ষাজীবনে অধ্যয়নরত। পারিবারিকভাবে শিক্ষাবান্ধব ও সামাজিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী একটি পরিবার থেকে উঠে আসা রাব্বির ব্যক্তিত্বেও এর প্রতিফলন দেখা যায় বলে স্থানীয়রা মনে করেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি ধারাবাহিকভাবে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে গেছেন। ১৯৮৭ সালে কালিকাপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৮৯ সালে সোনাইমুড়ী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৯২ সালে চৌমুহনী সরকারি এস এ কলেজ থেকে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি নেতৃত্বগুণের পরিচয় দেন এবং সহপাঠীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
রাজনৈতিক জীবনে তার যাত্রা শুরু হয় ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে। স্কুল জীবন থেকেই তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন হন। ১৯৮৭ সালে কলেজ কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা ছিল একটি নির্বাচিত পদ। এই সময় তিনি ছাত্রদের অধিকার আদায় এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
এরপর তিনি জেলা ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তৃণমূল থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত সংগঠনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকেন। পরবর্তীতে উপজেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সংগঠনের আর্থিক ও সাংগঠনিক দিক শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখেন।
২০১০ সালে তিনি পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান। এরপর ২০১৬ সালে পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা তার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই সময় তিনি সংগঠনকে সুসংগঠিত করা, দলীয় কার্যক্রম জোরদার করা এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তীতে জেলা বিএনপির তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, তথ্য সংগ্রহ এবং দলীয় নীতিনির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। ২০২২ সালে পৌর বিএনপির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান এবং ২০২৫ সালেও এই দায়িত্বে বহাল রয়েছেন, যা তার প্রতি দলের আস্থার প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামেও তার সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলনে তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম এবং দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার অংশগ্রহণ তাকে তৃণমূলের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার সমর্থকদের মতে, তিনি কখনো কঠিন পরিস্থিতি থেকে পিছু হটেননি, বরং সবসময় দলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তবে তার রাজনৈতিক জীবনে চ্যালেঞ্জও কম ছিল না। বিভিন্ন সময়ে তিনি মোট ১১টি মামলার আসামি হয়েছেন এবং কারাবরণ করেছেন। তার সমর্থকরা এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন এবং এটিকে তার সংগ্রামী জীবনের অংশ হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, এই অভিজ্ঞতা তাকে আরও দৃঢ় এবং পরিণত নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছে।
রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। তিনি উপজেলা মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। এছাড়া সোনাইমুড়ী জাকাত কল্যাণ সমিতির দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সহায়তায় ভূমিকা রাখছেন। সোনাইমুড়ী বালিকা বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রেও তার অবদান রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, তার এই বহুমুখী অভিজ্ঞতা তাকে একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। তারা মনে করেন, একজন মেয়র হিসেবে তার সবচেয়ে বড় শক্তি হবে তার সংগঠক হিসেবে দক্ষতা এবং মানুষের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ।
বর্তমানে তিনি সোনাইমুড়ী পৌরসভার মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী বা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। তার সমর্থকরা ইতোমধ্যে বিভিন্নভাবে প্রচারণা শুরু করেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাকে নিয়ে ইতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা বিশ্বাস করেন, তিনি মনোনয়ন পেলে এবং নির্বাচিত হলে পৌরসভায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এমন একজন মেয়র চান যিনি শুধু নির্বাচনের সময় নয়, বরং সবসময় মানুষের পাশে থাকবেন। তারা চান, পৌরসভার উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আসুক, দুর্নীতি কমে আসুক এবং নাগরিক সেবা সহজলভ্য হোক। অনেকেই মনে করছেন, নতুন প্রজন্মের চাহিদা অনুযায়ী একটি আধুনিক পৌরসভা গড়ে তুলতে হলে পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে সৈয়দ রেজায়ে রাব্বি (মাহবুব) এর নামটি সামনে আসছে একজন সম্ভাবনাময় প্রার্থী হিসেবে। তার সমর্থকরা বলছেন, তিনি যদি মেয়র নির্বাচিত হন, তাহলে সোনাইমুড়ী পৌরসভাকে একটি আধুনিক, উন্নত এবং বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
তবে শেষ পর্যন্ত কে হবেন সোনাইমুড়ী পৌরসভার পরবর্তী মেয়র, তা নির্ধারণ করবে জনগণই। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নেবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের যে জোরালো দাবি উঠেছে, সেখানে সৈয়দ রেজায়ে রাব্বি (মাহবুব) একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছেন—এটা বলাই যায়।
সোনাইমুড়ীর রাজনীতিতে এই পরিবর্তনের হাওয়া কতটা প্রভাব ফেলবে এবং তা নির্বাচনের ফলাফলে কীভাবে প্রতিফলিত হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সাধারণ মানুষ এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব উন্নয়ন এবং সুশাসন চায়। আর সেই প্রত্যাশা পূরণে কে এগিয়ে আসবেন, সেটিই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের নেতৃত্ব।

