ভূমিধস্যদের দখলে খাল ভয়াবহ সমস্যা সোনাইমুড়ী বাসী,
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার ৯ নং দেউটি ইউনিয়নের দুয়ারীপাড়া গ্রামে খাল দখল আজ এক ভয়াবহ সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী কিছু ভূমিদস্যু বাঘারবার হোলের গোড়া থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত খালটির ওপর অবৈধ দখলদারি চালিয়ে আসছে। তারা খালের মূল প্রবাহ বন্ধ করে তার ওপর রাস্তা তৈরি করেছে এবং খাল ভরাট করে বসতবাড়ি নির্মাণ করছে। অথচ বারবার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার পরও এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। স্থানীয়রা প্রশাসনের নীরব ভূমিকার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কিছু প্রভাবশালী মহল প্রশাসনের ভেতরের একশ্রেণির ব্যক্তির সঙ্গে আঁতাত করে খাল দখল বৈধ করার চেষ্টা করছে। এ কারণে বারবার অভিযোগ করার পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। খাল হলো জনসাধারণের সম্পদ, অথচ সেটি ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। এই অবৈধ দখল শুধু আইন ভঙ্গই নয়, বরং পুরো গ্রামীণ জনজীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে।
খালটির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সামান্য বৃষ্টি বা বন্যাতেই পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কৃষিজমি, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট—সবকিছু পানির নিচে চলে যায়। কৃষকদের ফসল নষ্ট হয়ে যায়, বসতভিটা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না, গ্রামের ছোট ছোট রাস্তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে যায়। অথচ প্রশাসন এ অবস্থার উন্নতিতে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
স্থানীয় কৃষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিবার বর্ষা এলে তারা আতঙ্কে দিন কাটান। বৃষ্টি শুরু হলেই পানির ঢল নেমে আসে। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তাদের জমি নষ্ট হয়ে যায়। এক কৃষকের ভাষায়, “আমরা যে জমিতে ধান চাষ করি, সেই জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফসল পচে যায়। কয়েক বছর ধরে এমন অবস্থা চলছে। খাল দখল না হলে এসব সমস্যা হতো না।”
এলাকার সুশীল সমাজও খাল দখলের ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা বলছেন, প্রভাবশালীরা খাল ভরাট করে রাস্তা বানাচ্ছে, অথচ প্রশাসন নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মতে, এটা শুধু একটি খালের দখল নয়, এটা পুরো এলাকার জীবন ও প্রকৃতির ওপর আঘাত। খাল হলো প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ। একে ভরাট করলে বা দখল করলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়। এর ফল ভোগ করছে পুরো গ্রামবাসী।
দুয়ারীপাড়া গ্রামসহ আশপাশের মানুষেরা বারবার দাবি জানিয়েছে খালটি খনন করার জন্য। তারা বলছেন, খাল খনন হলে পানি নিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা তৈরি হবে, জমি ও ঘরবাড়ি রক্ষা পাবে। কিন্তু প্রশাসন সেই দাবিকে আমলে নিচ্ছে না। তাদের এই নীরবতা প্রকৃতপক্ষে দখলদারদের পক্ষ নেওয়ার সমান বলে মনে করছেন অনেকেই।
একজন প্রবীণ সমাজকর্মী বলেন, “খাল হলো আমাদের জীবনের অংশ। পানি নিষ্কাশনের একমাত্র উপায় এই খাল। কিন্তু কিছু লোক দখল করে রাস্তা বানাচ্ছে। এটা তো জনগণের সম্পত্তি, এটা কোনো ব্যক্তির নয়। অথচ প্রশাসন চুপ করে আছে। আমরা প্রতিবাদ জানাচ্ছি, কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না।”
স্থানীয়দের দাবি, শুধু দুয়ারীপাড়া নয়, দেউটি ইউনিয়নের আরও অনেক খাল ভূমিদস্যুদের কবলে চলে গেছে। দখলদাররা রাজনৈতিক পরিচয় আর প্রভাব খাটিয়ে এসব দখল বজায় রাখছে। যদি এখনই দখলমুক্ত করা না হয়, তবে আগামীতে ভয়াবহ পরিণতি ঘটবে। কারণ খাল না থাকলে পানি জমে থাকবে, বন্যা হবে, কৃষি উৎপাদন নষ্ট হবে, বসতভিটা ধ্বংস হবে। এভাবে গোটা ইউনিয়ন জলাবদ্ধতার অভিশাপে জর্জরিত হয়ে পড়বে।
প্রশাসনের নীরব ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। তারা মনে করছেন, প্রশাসন ইচ্ছা করলেই দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে। সরকারি খাল ভরাট ও দখল করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ এই অপরাধীরা প্রভাবশালী হওয়ায় আইনের আওতায় আসছে না। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছে, তবে কি আইনের শাসন শুধু দুর্বলদের জন্য? প্রভাবশালী দখলদারদের জন্য কোনো আইন নেই?
এলাকাবাসী জোরালোভাবে জানাচ্ছেন, তারা কোনোভাবেই এই অবৈধ দখল মেনে নেবেন না। তারা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে, সভা-সমাবেশ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তারা খাল দখলের চিত্র প্রকাশ করছেন। তারা প্রশাসনের উদ্দেশে বলছেন, যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে তারা আরও কঠোর আন্দোলনে নামবেন।
এলাকাবাসীর দাবি খুবই সরল—খাল বাঁচাতে হবে, খাল খনন করতে হবে। প্রশাসন যদি সত্যিই জনগণের প্রশাসন হয়, তবে তাদের অবিলম্বে খাল দখলমুক্ত করে খনন কার্যক্রম শুরু করতে হবে। এই খাল শুধু একটি পানি নিষ্কাশনের পথ নয়, এটি পুরো গ্রামকে টিকিয়ে রাখার প্রাণশক্তি।
আজ যখন পরিবেশ রক্ষার কথা বলা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি নিয়ে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে, তখন খাল দখলের মতো ঘটনা চলতে থাকাটা চরম বেদনাদায়ক। এটা শুধু পরিবেশের ক্ষতি করছে না, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এলাকাবাসী সরাসরি ঘোষণা দিয়েছেন—তারা দখলদারদের এই অন্যায় কখনো মেনে নেবেন না। জনগণের সম্পদ জনগণের কাছেই ফিরিয়ে আনতে হবে। আর যদি প্রশাসন নীরব থাকে, তবে এই নীরবতা দখলদারদের প্রশ্রয় দেওয়ার সমান।
দুয়ারীপাড়ার মানুষ আজ এককথায় বলছেন: “খাল বাঁচাতে হবে, জীবন বাঁচাতে হবে।” খাল ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় প্রশাসনের নীরবতা একদিন ভয়াবহ বন্যা, জলাবদ্ধতা ও কৃষি বিপর্যয়ের দায়ে পরিণত হবে।

