দেশে নাগরিক সেবা ডিজিটালাইজেশনের যুগে প্রবেশ করলেও জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেন থামছেই না। একদিকে জন্মনিবন্ধন অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডাটাবেজেও শিক্ষার্থীদের জন্মতারিখ সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই তথ্যসমূহ কার্যকরভাবে সমন্বয় না হওয়ায় নাগরিকদের বারবার একই তথ্য প্রদান করতে হচ্ছে, যা শুধু সময়ের অপচয়ই নয়—বরং এক ধরনের অপ্রয়োজনীয় হয়রানিরও নামান্তর।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অধিদপ্তর—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের অধীনেই পরিচালিত হয় জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সেবা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই সেবাগুলো পেতে গেলে সাধারণ মানুষকে নানা জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তথ্য যাচাই, ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ দেওয়া, বারবার অফিসে যাতায়াত—এসব যেন একটি দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিদ্যমান ডিজিটাল অবকাঠামো যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে এই সমস্যার বড় অংশই সমাধান করা সম্ভব। বর্তমানে জন্মনিবন্ধন তথ্য অনলাইনে রয়েছে, যা স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় পরিচালিত হয়। একইভাবে, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার তথ্যও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকে। এই দুই উৎসের তথ্যকে সমন্বিত করে একটি কেন্দ্রীয় নাগরিক ডাটাবেজ তৈরি করা গেলে নাগরিকদের আর আলাদাভাবে তথ্য জমা দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।
প্রস্তাবিত বয়সভিত্তিক পরিচয়পত্র ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। এই ব্যবস্থায় ০ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুদের জন্য “শিশু কার্ড” চালু করা হলে জন্মনিবন্ধনের তথ্য থেকেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি করা সম্ভব। এতে শিশুর স্বাস্থ্য, টিকাদান এবং শিক্ষার প্রাথমিক তথ্য একসঙ্গে সংরক্ষণ করা যাবে।
৭ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য “স্টুডেন্ট কার্ড” চালু করা হলে তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ফলে শিক্ষার্থীদের আলাদা করে পরিচয়পত্রের জন্য আবেদন করতে হবে না। এই কার্ড ব্যবহার করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ, বৃত্তি গ্রহণ এবং অন্যান্য শিক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম সহজ হবে।
১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র ইস্যু করার ব্যবস্থা চালু করা গেলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে অনেকেই বয়স পূর্ণ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন আইডি কার্ড পান না। আবেদন, যাচাই ও অনুমোদনের ধীরগতির কারণে তারা ভোটাধিকারসহ নানা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। অথচ জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইডি কার্ড প্রদান করা হলে এই সমস্যার অবসান ঘটানো সম্ভব।
৬৫ বছর ঊর্ধ্ব নাগরিকদের জন্য “বয়স্ক কার্ড” চালু করার প্রস্তাবও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এতে বয়স্ক ভাতা, চিকিৎসা সুবিধা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও সহজ ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যাবে। একইসঙ্গে প্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্য আলাদা পরিচয়পত্র চালু করা হলে তাদের জন্য নির্ধারিত সুবিধাগুলো দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
এছাড়া পেশাভিত্তিক “পেশাজীবী কার্ড” চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ১৮ বছর পর নাগরিকদের পেশাগত পরিচয় যুক্ত করা গেলে শ্রমবাজার, কর ব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও সুসংগঠিত হবে। এতে সরকার সহজেই জানতে পারবে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রকৃত অবস্থা এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবে।
পাসপোর্ট সেবার ক্ষেত্রে সমস্যা আরও প্রকট। বিদেশগামী শ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং প্রবাসীদের জন্য পাসপোর্ট একটি অত্যাবশ্যকীয় দলিল হলেও এটি পেতে গিয়ে তাদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো, দালালের খপ্পরে পড়া এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের মতো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট না পাওয়ায় বিদেশ যাত্রাও বিলম্বিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য এবং জন্মনিবন্ধনের ডাটাবেজ একীভূত করা যায়, তাহলে পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে। নাগরিকের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য আলাদা করে কাগজপত্র জমা দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। অনলাইনেই আবেদন, যাচাই এবং অনুমোদন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে দালালচক্রের প্রভাব। অনেক সাধারণ মানুষ সঠিক প্রক্রিয়া না জানার কারণে দালালের সাহায্য নিতে বাধ্য হন। এতে তারা প্রতারণার শিকার হন এবং অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়। এই দালালচক্র বন্ধ করতে হলে সরকারি সেবাগুলোকে আরও স্বচ্ছ ও সহজলভ্য করতে হবে।
এক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশন পর্যায়ে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা যেতে পারে। যেখানে নাগরিকরা এক জায়গা থেকেই জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্ট সংক্রান্ত সব সেবা পাবেন। এতে সময় ও খরচ দুই-ই কমবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই উদ্যোগগুলো পুরোপুরি সফল হচ্ছে না। তাই এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত পরিকল্পনা, যেখানে সব ডাটাবেজ একত্রিত হয়ে একটি কেন্দ্রীয় নাগরিক সেবা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে।
এছাড়া সেবার মান উন্নয়নে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং তা না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখতে হবে। একইসঙ্গে নাগরিকদের জন্য অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে তারা হয়রানির শিকার হলে দ্রুত প্রতিকার পান।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতা থাকলে এই সমস্যার সমাধান কঠিন নয়। উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও নাগরিক সেবাকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব। এতে শুধু মানুষের ভোগান্তিই কমবে না, বরং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে।
একটি আধুনিক, স্মার্ট এবং নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্র গড়তে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সেবাকে সহজ, দ্রুত এবং সম্পূর্ণ হয়রানিমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছে, এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে ডিজিটালাইজেশনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
এই বাস্তবতায় সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সেবার মান উন্নয়ন, দালালচক্র নির্মূল এবং প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল একটি কার্যকর, স্বচ্ছ এবং মানবিক নাগরিক সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে—যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার প্রাপ্য সেবা পাবে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে।

