একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকাঠামো, হারানো জনআস্থা এবং বিপর্যস্ত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মব সন্ত্রাস, নারী ও শিশু নির্যাতন, চরমপন্থী উগ্রবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে সরকার গ্রহণ করে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। বিগত ৬ মাসে (ফেব্রুয়ারি–আগস্ট ২০২৬) বাংলাদেশ পুলিশের পেশাদারিত্ব পুনরুদ্ধার, কঠোর অভিযানিক তৎপরতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের সার্বিক সার্বিক অপরাধের হার দৃশ্যমানভাবে হ্রাস পেয়েছে।
১. অপরাধ পরিসংখ্যানের তুলনামূলক চিত্র (২০২৫ বনাম ২০২৬)
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অপারেশনস শাখার তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে প্রায় সব ধরণের প্রধান প্রধান অপরাধ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে:
- হত্যাকাণ্ড হ্রাস: ২০২৫ সালের জানুয়ারি-আগস্টে মোট খুনের সংখ্যা ছিল ২,৬০৭টি। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২,২৫০টি-তে (হ্রাসের সংখ্যা ৩৫৭টি)।
- নারী ও শিশু নির্যাতন: বিগত বছরের ১১,২৬৯টি মামলার বিপরীতে চলতি বছরে তা কমে এসেছে ৯,০৮৪টি-তে (হ্রাস ২,১৮৫টি)।
- ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলা: ২০২৫ সালের ৪,৬৬৬টি অপরাধের বিপরীতে ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪,২৬৪টি-তে (হ্রাস ৪০২টি)।
- মব ও সংখ্যালঘু নির্যাতন দমন:
- মব জাস্টিস/সহিংসতা: ২০২৫ সালে মব সংক্রান্ত ঘটনা ছিল ৮৯টি, যা ২০২৬ সালে কমে ৫৬টি-তে নেমে এসেছে।
- সংখ্যালঘু নির্যাতন: ২০২৫ সালে রেকর্ডকৃত ৯৯৯টি ঘটনার জায়গায় ২০২৬ সালে তা ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়ে ১৬৩টি-তে দাঁড়িয়েছে (৮৩৬টি ঘটনা হ্রাস)।
| অপরাধের ধরণ (জানুয়ারি-আগস্ট)২০২৫ সাল২০২৬ সালপরিবর্তন (হ্রাস) | অপরাধের ধরণ (জানুয়ারি-আগস্ট)২০২৫ সাল২০২৬ সালপরিবর্তন (হ্রাস) | অপরাধের ধরণ (জানুয়ারি-আগস্ট)২০২৫ সাল২০২৬ সালপরিবর্তন (হ্রাস) | অপরাধের ধরণ (জানুয়ারি-আগস্ট)২০২৫ সাল২০২৬ সালপরিবর্তন (হ্রাস) |
| খুন/হত্যা | ২,৬০৭টি | ২,২৫০টি | -৩৫৭টি |
| নারী ও শিশু নির্যাতন | ১১,২৬৯টি | ৯,০৮৪টি | -২,১৮৫টি |
| ধর্ষণ | ৪,৬৬৬টি | ৪,২৬৪টি | -৪০২টি |
| মব সংক্রান্ত ঘটনা | ৮৯টি | ৫৬টি | -৩৩টি |
| সংখ্যালঘু সংক্রান্ত ঘটনা | ৯৯৯টি | ১৬৩টি | -৮৩৬টি |
২. বিশেষ অভিযান, অপরাধী গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র-মাদক উদ্ধার
অপরাধচক্র ও দুষ্কৃতকারীদের দমনে দেশব্যাপী পরিচালিত বিশেষ অভিযানে পুলিশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে:
- দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান (১ মে – ২৬ আগস্ট ২০২৬):
- অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী, অস্ত্রধারী, মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজসহ মোট ৫৩,৫১৮ জন দুষ্কৃতকারীকে গ্রেফতার করা হয়।
- ১৭ ফেব্রুয়ারি হতে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত মোট ৮১০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০,৩৮০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার ও ১,১৮৮ জন গ্রেফতার হয়।
- বিপুল পরিমাণ মাদকের মধ্যে ১ কোটি ৩৪ লাখের বেশি ইয়াবা, ৭৫.৬ কেজি হেরোইন, ৩৮.৭ টন গাঁজাসহ অন্যান্য মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।
- ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাফল্য:
- ডিএমপি’র বিশেষ অভিযানে ৭,৬৬৮ জন গ্রেফতারের পাশাপাশি ৫০টি’র বেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল, ৩১.৭ কেজি বিস্ফোরক এবং বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করা হয়।
- মোহাম্মাদপুর ও আদাবর এলাকার ত্রাস চিহ্নিত সন্ত্রাসী ‘পিচ্চি রাজা’-কে ২০ মে ২০২৬ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়।
- নো-ম্যান্স ল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ (জংগল সলিমপুর): গত ৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের প্রায় ৪,০০০ সদস্য যৌথ অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম জেলার অপরাধের অভয়ারণ্য ‘জংগল সলিমপুর’-এ সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
- সাম্প্রতিক ২৪ ঘণ্টারচিত্র (০৭-০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬): এক দিনেই সারাদেশে মোট ১,৯৫৩ জন (যার মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ৭৩ জন সদস্য) গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে আগ্নেয়াস্ত্র, কার্তুজ ও মাদক উদ্ধার করা হয়।
৩. বিচার বিভাগের গতিশীলতা ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ
অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিচারব্যবস্থায় ইতিবাচক নজির স্থাপন করা হয়েছে:
- পল্লবীর শিশু রামিসা হত্যা ও ধর্ষণ মামলা: ৭ বছরের শিশু রামিসা হত্যার পর মাত্র ৬ দিনের মধ্যে দ্রুততম সময়ে তদন্ত ও ডিএনএ রিপোর্ট শেষে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় (৭ জুন ২০২৬) আসামিদের ফাঁসির আদেশ দেয় আদালত।
- চট্টগ্রামের বাকলিয়া মামলা: ৪ বছরের শিশু ফারিয়াকে ধর্ষণের ঘটনায় পুলিশ দ্রুততম ১৩ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করায় আসামি আদালতে যাবজ্জীবন দণ্ডে দণ্ডিত হয়।
৪. সাইবার সিকিউরিটি ও সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার রোধ
বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানিকর গুজব ও ধর্মীয় উস্কানি প্রতিরোধে জিরো-টলারেন্স দেখানো হচ্ছে:
- পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এলআইসি (LIC) শাখা প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ করে সামাজিক মাধ্যমে মানহানিকর ও অপপ্রচারমূলক পোস্ট করছে।
- সরকার প্রধান, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ও রাষ্ট্রীয় বিষয়ের বিরুদ্ধে ছড়ানো ২,৫৪৪টি বিভ্রান্তিকর লিংকের মধ্যে বিটিআরসির সাহায্যে ৯৯১টি লিংক রিমুভ করা হয়েছে।
- অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগে সাবিদুল ইসলাম সিয়ামসহ মোট ৬ জন মূল প্রচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
৫. প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধি
- স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়াকরণ: সম্পূর্ণ মেধা ও মেধার ভিত্তিতে ২,৬৬৫ জন কনস্টেবল নিয়োগ সম্পন্ন করে প্রশিক্ষণ শুরু করা হয়েছে। পাশাপাশি ২,০০০ ক্যাডেট এএসআই নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
- প্রযুক্তির ব্যবহার ও নিরপেক্ষতা নির্বাচন: বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ উপ-নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রথমবার সব কেন্দ্রে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ (Body Worn Camera) ব্যবহার করা হয়। ডিএমপিতে প্রবর্তিত হয়েছে এআই (AI) ট্রাফিক ক্যামেরা ও সিসিটিভি কন্ট্রোল রুম।
- উৎসাহ ও স্বীকৃতি: ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ৩টি ধাপে পুলিশের ৩৯ জন বীরত্বপূর্ণ ও সাহসী সদস্যকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আর্থিক পুরস্কার ও সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
- আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপ: বিদেশে আত্মগোপনে থাকা অপরাধীদের আনতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের মাধ্যমে চুক্তি জোরদার করা হয়েছে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গত ১২ জুন ২০২৬ সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেফতারের পর ১৬ জুন বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে।
৬. উদীয়মান চ্যালেঞ্জ ও সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ
স্বাভাবিকতা ফিরলেও একাধিক চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি দৃশ্যমান হচ্ছে, যা সতর্কভাবে সামাল দিচ্ছে প্রশাসন:
- নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা ও মব ডাইনামিক্স:
- গত ১৭ ফেব্রুয়ারি হতে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ২৬৩টি ঘটনার বিপরীতে ৫৯টি মামলায় ২৫২ জন গ্রেফতার হয়েছে।
- সাম্প্রতিক সময়ে (০৭ সেপ্টেম্বর) রাজশাহী, গাজীপুর ও পাবনায় নিষিদ্ধ সংগঠনের ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটে, যেখানে পুলিশ ঈশ্বরদীতে ১ জনসহ বেশ কয়েকজনকে আইনের আওতায় এনেছে।
- গত ৬ মাসে ৩৬টি মব সংক্রান্ত ঘটনায় ৩০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ১০৬টি পুলিশি হামলার ঘটনায় ১ জন পুলিশ নিহত ও ২৩০ জন আহত হন।
- গুজব ও গণ-উত্তেজনা: বরিশাল আগৈলঝাড়ায় এক আসামির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে থানায় হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে, যেখানে পুলিশ আইনি প্রক্রিয়ায় ৩২ জনকে গ্রেফতার করেছে।
- সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা চিত্র (০৭-০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬):
- ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে মাদ্রাসার ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে প্রধান শিক্ষক গ্রেফতার।
- সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় নারী পুলিশসহ সদস্যদের মারধরের ঘটনা।
- কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে ডিলারদের থেকে সারের দাবিতে কৃষকদের ক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা যৌথ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে নিরসন।
মাত্র ৬ মাসের সংক্ষিপ্ত সময়ে একটি বিপর্যস্ত পুলিশ বাহিনীকে সুসংগঠিত করে সার্বিক অপরাধের হার কমিয়ে আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচারে সহায়তা প্রদান করা বর্তমান সরকারের বড় সাফল্য। ‘জিরো কমপ্লেইন সেন্টার’, বিডি ওয়াচিং প্রযুক্তির প্রসার এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাহিনীকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে চলেছে। কিছু বিচ্ছিন্ন চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক অপতৎপরতা বিদ্যমান থাকলেও, কঠোর পদক্ষেপ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের মাধ্যমে দেশে স্থায়ী শান্তি ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের পথ প্রশস্ত হয়েছে।

