• ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

শ্রমিকদের টানা আন্দোলনের মুখে ১৩০টি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত নভেম্বর ১২, ২০২৩, ০৮:৫৩ পূর্বাহ্ণ
শ্রমিকদের টানা আন্দোলনের মুখে ১৩০টি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা
ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের টানা আন্দোলনের মুখে অন্তত ১৩০টি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার ঢাকার সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই ও মিরপুরের বেশিরভাগ ফ্যাক্টরির মূল ফটকের সামনে ‘কারখানা বন্ধের’ নোটিস ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া ইতিপূর্বে গাজীপুরে ১২৩টি কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ২২ মামলায় অন্তত ৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র এক সমন্বয় সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি কারখানার সামনে ‘নিয়োগ বন্ধ’ লেখা ব্যানারও টানিয়ে দেয় গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ।

মিরপুরে ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা প্রত্যাখ্যান করে তা বৃদ্ধির দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। দুপুর ২টার দিকে মিরপুর ১৩ নম্বরে পুলিশ কনভেনশন হলের সামনে তারা সড়ক অবরোধ করেন। পরে পুলিশ তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এদিকে, ন্যূনতম মজুরি ২৩ হাজার থেকে ২৫ টাকা করার দাবিতে গত কয়েকদিন যাবৎ আন্দোলন করছে গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকরা। আন্দোলনে অর্ধশতাধিক শ্রমিক সংগঠন যুক্ত হয়েছে। ফলে ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা মেনে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন পক্ষ থেকে বলা হলেও তা আমলে নেওয়া হচ্ছে না। বরং শ্রমিকরা ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করছেন। কাজে যোগদান করতে এসে শ্রমিকরা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ছেন।

কারখানার শ্রমিকরা সকালে কাজে এসে আবার যার যার বাসায় ফিরে গেছেন। তবে এসব এলাকা শান্ত রয়েছে। শনিবার সকালে এ তথ্য জানিয়েছেন আশুলিয়া শিল্পায়ন পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম। তিনি বলেন, যেসব কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করতে আগ্রহী, সেগুলোতে কাজ চলছে। তাদের কাজ চলমান থাকবে। তবে বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টরি বন্ধ। এসব কারখানার শ্রমিকরা চলে যান এবং বিভিন্ন উচ্ছৃঙ্খলতা প্রকাশ করেন। এমন ১০০ কারখানা তারা অনির্দিষ্ট কালের জন্য শ্রম আইনে ১৩ এর ১ ধারায় বন্ধ রয়েছে। সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই মিলে এখানে ১৭৯২টি কারখানার ভেতর ১৩০টি কারখানা বন্ধ রয়েছে।

এরমধ্যে কিছু কিছু কারখানা সাধারণ ছুটি ছিল এগুলো আজ রবিবার খুলে দেওয়া হবে। তবে সাভার ও আশুলিয়ার সামগ্রিক পরিবেশ-পরিস্থিতি ভালো বলে জানান পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, খোলা কারখানাগুলোর শ্রমিকরা কাজ করছেন। আর কাজের পরিবেশ ধরে রাখার জন্য আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব সময় তৎপর রয়েছি। সকাল থেকে দেখা গেছে, আশুলিয়ার টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের জামগড়া, নরসিংহপুর, ছয়তলা, জিরাবো এলাকার দুই পাশে থাকা পোশাক কারখানাগুলো প্রায় বন্ধ রয়েছে। কারখানাগুলোর সামনে সাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে নোটিস।

 

বন্ধ কারখানাগুলো হলো-টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের দি রোজ ড্রেসেস লিমিটেড, দ্যাটস ইট স্পোর্টস ওয়্যার লিমিটেড, অনন্ত গার্মেন্টস লিমিটেড, হা-মীম, শারমীন, পাইওনিয়ার লিমিটেড এবং জিরাবো-বিশমাইল সড়কের এআর জিন্স প্রডিউসার লিমিটেড, ডুকাটি অ্যাপারেলস লিমিটেড, আগামী অ্যাপারেল লিমিটেড, ক্রোসওয়্যার লিমিটেড, সেইন অ্যাপারেলস লিমিটেড, টেক্সটাউন লিমিটেড, অরনেট নিট গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডসহ শতাধিক পোশাক কারখানা।

 

নিজস্ব সংবাদদাতা সাভার থেকে জানান, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের টানা আন্দোলনের কারণে ঢাকার সাভার ও ধামরাইয়ে শতাধিক পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। শনিবার সকালে প্রায় ১শ’ ৩০টি কারখানার মূল ফটকের সামনে এ বন্ধের নোটিস ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র এক সমন্বয় সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি কারখানার সামনে ‘নিয়োগ বন্ধ’ লেখা ব্যানারও টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। শনিবার আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পোশাক কারখানাই শ্রম আইন ১৩/১ ধারায় বন্ধ ঘোষণা করে কারখানার গেটে নোটিস ঝুলিয়ে দিয়েছে।

 

শারমীন গ্রুপের শারাফ এমব্রয়ডারি অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেডের নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৩০ অক্টোবর থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত এ কারখানার শ্রমিকরা বেআইনিভাবে কাজ বন্ধ রেখে সকাল বেলা হাজিরা দিয়ে বের হয়ে চলে যায়। এ ছাড়াও শ্রমিকরা কারখানার ভেতর ও বাইরে ব্যাপক ভাঙচুর, মারামারি, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যাতে কারখানার সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি ও আর্থিক ক্ষতি সাধনও হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে গত ১ ও ২ নভেম্বর সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এরপরও শ্রমিকরা ফ্যাক্টরিতে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি ও ভাঙচুর অব্যাহত রাখে। এসব ঘটনাকে ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬’ অনুযায়ী ‘অবৈধ ধর্মঘট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এ নোটিসে। এ কারণে শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারা অনুযায়ী আজ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে তারা।

 

 

হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ৭ মামলা ॥ আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম জানান, মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনকালে বিভিন্ন কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় এখন পর্যন্ত সাতটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ১৬ জনের নাম উল্লেখ করাসহ অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়েছে। তার মধ্যে মামলায় যাদের নাম ছিল এবং এসব ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত ছিল তাদের মধ্য থেকে তিনজন ও অজ্ঞাতনামাদের মধ্য থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম আরও জানান, গত বুধ ও বৃহস্পতিবারের তুলনায় আজকের পরিস্থিতি অনেকটাই ভালো আছে।

 

বেশির ভাগ কারখানায় শান্তিপূর্ণভাবে কাজ চলছে। তবে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আশুলিয়া, সাভার ও ধামরাইয়ে ১৩০টি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যেসব কারখানা চলছে, ওই সব কারখানার নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। এদিকে রাজধানীতেও ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা প্রত্যাখ্যান করে তা বৃদ্ধির দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। শনিবার দুপুর ২টার দিকে মিরপুর ১৩ নম্বরে পুলিশ কনভেনশন হলের সামনে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। পরে পুলিশ তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়।

 

বিকেল ৪টায় কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুকুল আলম মিরপুর ১৩ ও ১৪ নম্বর এলাকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিক বেতন বৃদ্ধির দাবিতে দুপুরে রাস্তায় নামেন। শ্রমিকরা আধাঘণ্টার মতো সড়কে অবস্থান করেন। পরে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আন্দোলনরত এক শ্রমিক বলেন, যে বেতন মালিকরা নির্ধারণ করেছেন সে বেতনে আমাদের কিছুই হবে না। আমাদের বেতন আরও বাড়াতে হবে। এ দাবিতে আমরা রাস্তায় নেমেছি। পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে গত ৭ নভেম্বর ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে শ্রমিক নেতারা ঘোষিত মজুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

 

 

স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর জানান, পোশাক শিল্পে শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোকে কেন্দ্র করে গাজীপুরে ১২৩ কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা। ওই ঘটনায় বিভিন্ন থানায় ২২টি মামলায় এ পর্যন্ত ৮৮জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শীঘ্রই বন্ধ কারখানা খুলে উৎপাদনে যাবে সব শিল্প কারখানা। শনিবার দুপুরে শিল্প পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) জাকির হোসেন খান শ্রমিক আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত কোনাবাড়ি এলাকার পোশাক কারখানা তুসুকা গার্মেন্টস্ পরিদর্শনে এসে এসব তথ্য জানিয়েছেন। ডিআইজি জাকির হোসেন খান বলেন, গাজীপুরের কোনাবাড়ি, কাশিমপুর ও ভোগড়া এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ হলেও কোনাবাড়িতে শ্রমিকদের আন্দোলন হয়েছে বেশি।

 

আশুলিয়াতে কিছুটা আছে এবং চট্টগ্রাম এলাকায় আন্দোলন নেই। আমাদের ধারণা, কোনাবাড়িতে একটা গ্রুপ আন্দোলন করার জন্য শ্রমিকদের উস্কানি ও মদদ দিচ্ছে। যারা উস্কানি দিচ্ছে তাদের বা ওইসব গ্রুপকে চিহ্নিত করার কাজ করছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ ও ইন্টেলিজেন্স সেল। তিনি বলেন, শিল্প পুলিশ, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ, র‌্যাব, জেলা পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ঘোষণা করেছে। এখানে যারা উস্কানি দিচ্ছে, আমরা তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি।